রুকাইয়াহ প্রশ্ন উত্তর: আত্মার নিরাময়ের পথে ইসলামী দিকনির্দেশনা

জীবনের কোনো পর্যায়ে আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই যেখানে চিকিৎসা, পরামর্শ বা ওষুধেও মন শান্ত হয় না। অকারণ ভয়, দুঃস্বপ্ন, মানসিক ভার, সংসারে টানাপোড়েন সবকিছু যেন এক অজানা অন্ধকারে ঢেকে যায়।

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, শরীর যেমন চিকিৎসা চায়, আত্মাও চায় আত্মিক চিকিৎসা।
আর সেই চিকিৎসার সবচেয়ে সুন্দর পথ হলো রুকাইয়া শারইয়াহ।

রুকাইয়াহ কি?

রুকাইয়া (رُقْيَة) শব্দের অর্থ হলো পাঠ বা দোয়া করা। ইসলামী পরিভাষায়, রুকাইয়া মানে হচ্ছে কুরআনের আয়াত ও সহীহ দোয়া দ্বারা আত্মিক বা মানসিক সমস্যা নিরাময় করা।

অর্থাৎ, রুকাইয়া হচ্ছে একেবারে শরীয়াহসম্মত আত্মিক চিকিৎসা, যেখানে কোনো তাবিজ, মন্ত্র বা কুসংস্কারের স্থান নেই।

রুকাইয়ার মাধ্যমে যেসব সমস্যা নিরাময় করা যায়:

  • মানসিক চাপ ও অস্থিরতা
  • ভয়, অনিদ্রা, দুঃস্বপ্ন
  • দাম্পত্য বা পারিবারিক অশান্তি
  • নজর, হাসাদ বা জ্বিনের প্রভাব
  • নামাজে মন না বসা বা আত্মিক দুর্বলতা

রুকাইয়া কেবল “চিকিৎসা” নয়, এটি হলো আত্মার পরিশুদ্ধি ও ঈমানের শক্তি পুনরুদ্ধার করার মাধ্যম।

কাদের জন্য প্রযোজ্য?

রুকাইয়া মূলত সবার জন্য প্রযোজ্য। যে কেউ যদি শারীরিকভাবে সুস্থ থেকেও অজানা ক্লান্তি, ভয়, বা অস্থিরতা অনুভব করেন, তিনি রুকাইয়া নিতে পারেন।

দাম্পত্য বা পারিবারিক সমস্যায়:
হঠাৎ করে সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভুল বোঝাবুঝি বা মানসিক দূরত্ব দেখা দিলে।

নজর বা হাসাদের প্রভাবে:
সাফল্য আসছে, কিন্তু বারবার বাধা পাচ্ছেন বা অকারণে ব্যর্থ হচ্ছেন।

জ্বিন ও শয়তানের কুমন্ত্রণায়:
ভয়, দুঃস্বপ্ন, নামাজে মনোযোগ হারানো বা শরীরে অস্বস্তি হলে।

আত্মিক দুর্বলতায়:
মন খারাপ, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা একাকিত্বের কারণে মানসিক ভার অনুভব করলে।

রুকাইয়া চিকিৎসা পুরুষ-মহিলা, শিশু-বৃদ্ধ সবার জন্য প্রযোজ্য কারণ এটি কুরআনের আলোয় নির্ভর করে, যা আল্লাহর রহমতের মাধ্যম।

নজর লাগা ও জ্বিন সমস্যা রুকাইয়াহে কীভাবে উপকার পায়?

নজর লাগা বা হাসাদ (অন্যের ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টি) ইসলামে বাস্তব ঘটনা।
রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“নজর (হাসাদ) সত্য।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৮৮)

নজর বা জ্বিনের প্রভাবে অনেক সময় একজন মানুষ শারীরিকভাবে সুস্থ থেকেও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। রুকাইয়া এসব প্রভাব দূর করতে সহায়তা করে কারণ এতে কুরআনের আয়াতগুলোর রুহানি প্রভাব (spiritual energy) কাজ করে।

রুকাইয়া সেশনে সাধারণত সুরা আল-বাকারা, আল-ইখলাস, আল-ফালাক, আন-নাস ইত্যাদি আয়াত পাঠ করা হয়। এগুলো শয়তান, জ্বিন, বা হাসাদের প্রভাব থেকে রক্ষা করে। একজন প্রশিক্ষিত রুকাইয়া প্র্যাকটিশনার রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্দিষ্ট আয়াত ও দোয়া পাঠ করেন এবং তাকে শেখান কীভাবে নিজেও রুকাইয়া চালিয়ে যাবেন।

FAQ: সেশন, সময়, মূল্য, পরামর্শ

প্রশ্ন ১: রুকাইয়া সেশন কিভাবে হয়?
উত্তর: রুকাইয়া সেশন সাধারণত প্রশিক্ষিত প্র্যাকটিশনার কুরআনের নির্দিষ্ট আয়াত পাঠের মাধ্যমে পরিচালনা করেন। রোগীকে শান্ত পরিবেশে বসে ওযু করে অংশ নিতে হয়।

প্রশ্ন ২: অনলাইন রুকাইয়া কি কার্যকর?
উত্তর: ইনশাআল্লাহ, অনলাইন রুকাইয়া সেশনও কার্যকর। Zoom বা WhatsApp-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হীলার কুরআনের আয়াত পাঠ করেন এবং রোগী তা শুনেন।

প্রশ্ন ৩: রুকাইয়া নিতে কত সময় লাগে?
উত্তর: সাধারণত প্রতিটি সেশন ৩০–৬০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সময় পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রশ্ন ৪: আমি কি নিজে রুকাইয়া করতে পারি?
উত্তর: অবশ্যই পারেন। নিজে নিজের জন্য বা পরিবারের জন্য কুরআনের আয়াত পাঠ করে রুকাইয়া করা শরীয়াহসম্মত। তবে জটিল ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ প্র্যাকটিশনারের সহায়তা নেওয়া উত্তম।

শেষকথা, রুকাইয়া শুধু একটি চিকিৎসা নয়, এটি আত্মাকে শান্ত ও শক্তিশালী করার এক সুন্দর পথ। কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে মন ফিরে পায় স্থিরতা আর জীবনে আসে নতুন আশার আলো। বিশ্বাস ও নিয়মিত দোয়াই পারে হৃদয়ের ভার কমিয়ে দিতে আর এনে দিতে সত্যিকারের প্রশান্তি। 

রাসূল (সাঃ)- এর নির্দিশিত চিকিৎসা পদ্ধিতির আলোকে জিন, জাদু, বদনজর, হাসাদ জনিত সমস্যা এবং সকল প্রকার শারীরিক – মানষিক রোগের চিকিৎসা করা হয়।