বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই হাঁটু, কোমর বা জয়েন্টে ব্যথা অনুভব করেন। এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যথাকে সাধারণভাবে আমরা “বাত” বা “আথ্রাইটিস” বলে থাকি। একসময় এটি শুধুমাত্র বৃদ্ধ বয়সের রোগ হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু আজকাল তরুণরাও এই সমস্যায় ভুগছেন – অস্বাস্থ্যকর খাবার, কম চলাফেরা ও স্ট্রেস এর অন্যতম কারণ।
বাতের চিকিৎসায় অনেকেই আধুনিক ওষুধ বা ব্যথানাশক ব্যবহার করেন, যা সাময়িকভাবে উপশম দিলেও মূল সমস্যা দূর করে না। ঠিক এই জায়গাতেই হিজামা থেরাপি (Cupping Therapy) একটি প্রাকৃতিক ও ইসলামিক বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
আর্থ্রাইটিসে হিজামার উপকারিতা
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হিজামা বাত বা আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি, কারণ এটি শরীরের রক্তপ্রবাহকে স্বাভাবিক করে, প্রদাহ (inflammation) কমায় এবং পেশি ও জয়েন্টে জমে থাকা টক্সিন দূর করে।
চলুন দেখি, হিজামা কীভাবে আর্থ্রাইটিসে কাজ করে –
১. প্রদাহ কমায়
আর্থ্রাইটিসে জয়েন্টে প্রদাহ তৈরি হয়, ফলে ব্যথা ও ফোলাভাব দেখা দেয়। হিজামা করার সময় ত্বকের নিচের জমে থাকা দূষিত রক্ত বেরিয়ে আসে, যা শরীরে ইনফ্লামেশন কমাতে সাহায্য করে।
২. রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়
হিজামা রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে, ফলে ব্যথার জায়গায় নতুন অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান পৌঁছে যায়। এটি জয়েন্ট রিপেয়ার প্রক্রিয়াকে দ্রুত করে।
৩. ব্যথা উপশম করে
গবেষণায় দেখা গেছে, হিজামা করার পর নিউরোট্রান্সমিটার এন্ডরফিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা শরীরের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। তাই আর্থ্রাইটিসের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা অনেকটাই হ্রাস পায়।
৪. টক্সিন ও জমে থাকা তরল দূর করে
হিজামা শরীর থেকে দূষিত পদার্থ, অপ্রয়োজনীয় তরল ও জমে থাকা মেটাবলিক বর্জ্য বের করে দেয়। এর ফলে জয়েন্টে চাপ কমে ও ফোলাভাব হ্রাস পায়।
৫. ওষুধ ছাড়াই প্রাকৃতিক উপশম
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, হিজামা কোনো কেমিক্যাল বা ওষুধ ছাড়াই শরীরের নিজস্ব নিরাময় প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে। তাই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে।
ইসলামিক প্রমাণ
হিজামা থেরাপি এমন একটি প্রাচীন চিকিৎসা, যা নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-আমল থেকেই প্রচলিত। ইসলামী হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, নবী করিম (সা.) নিজেও হিজামা করেছেন এবং তাঁর উম্মতকে এর প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
নবী করিম (সা.) বলেছেন:
“নিশ্চয় হিজামায় শেফা রয়েছে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ২২০৫)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর সূত্রে নবী (সাঃ) থেকে বর্নিত, “তিনি বলেন রোগমুক্তি তিন জিনিসের মধ্যে রয়েছে। হিজামা লাগানো, মধু পাণ করা এবং আগুন দিয়ে দাগ দেয়ার মধ্যে। তবে আমি আমার উম্মতকে আগুন দিয়ে দাগ দিতে নিষেধ করি”
এই হাদীস স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, হিজামা শুধু শারীরিক চিকিৎসা নয়, বরং এটি একটি বরকতময় সুন্নাহ।
রোগীর পর্যালোচনা ও রেজাল্ট
হিজামা নিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন তাদের অভিজ্ঞতা আশ্চর্যজনকভাবে ইতিবাচক।
১️) ৫০ বছর বয়সী একজন ভদ্রলোক (দীর্ঘ ৫ বছর ধরে হাঁটুর ব্যথায় ভুগছিলেন):
তিন মাস ধরে প্রতি মাসে একবার হিজামা করার পর তিনি জানান, হাঁটুর ব্যথা প্রায় ৭০% কমে গেছে এবং ওষুধের প্রয়োজনও অনেক কমে এসেছে।
২️) ৩৮ বছর বয়সী এক নারী (হাত ও কাঁধের ব্যথায় ভুগছিলেন):
প্রথম দুই সেশন পরেই ঘুম ভালো হতে শুরু করে এবং ব্যথার জায়গায় হালকা স্বস্তি অনুভব করেন। চার সেশনের পর প্রায় পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে হাত তুলতে পারেন।
৩️) ৬৫ বছর বয়সী একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক:
নিয়মিত হিজামা করার পর তাঁর ব্যথা ও ফোলাভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তিনি বলেন – “শুধু শরীর নয়, মনও এখন হালকা লাগে।”
এমন অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে, হিজামা শুধু শরীরের ব্যথা কমায় না, বরং বিশ্বাস ও প্রশান্তির এক গভীর সংযোগ তৈরি করে।
চিকিৎসকের দৃষ্টিতে
আধুনিক চিকিৎসকরা বলছেন, হিজামা রক্তপ্রবাহ ও ইমিউন সিস্টেম উন্নত করতে সাহায্য করে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা যায়, হিজামা থেরাপির মাধ্যমে আর্থ্রাইটিস রোগীদের ব্যথা ও প্রদাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা প্রমাণ করে এটি একটি বৈজ্ঞানিকভাবেও কার্যকর পদ্ধতি।
তবে যেকোনো থেরাপির মতো, হিজামাও অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের অধীনে করা উচিত।
শেষকথা, আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে হিজামা হতে পারে এক অসাধারণ ইসলামিক ও প্রাকৃতিক সমাধান। এটি শুধু শরীরের প্রদাহ দূর করে না, বরং আত্মার ভেতরেও প্রশান্তি আনে।
নিজের শরীরের অবস্থা বুঝে, অভিজ্ঞ থেরাপিস্টের পরামর্শে হিজামা করুন – ইনশাআল্লাহ ব্যথা কমবে, শরীরও আরাম পাবে আর আত্মাও পাবে সুন্নাহর প্রশান্তি।