অনলাইন রুকাইয়াহ সেশন: ঘরে বসেই আত্মার প্রশান্তির পথে

অনলাইন রুকাইয়াহ কি?

জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আমরা সবাই এমন এক সময়ের মুখোমুখি হই, যখন সব কিছু ঠিক থাকা সত্ত্বেও মন শান্তি পায় না। নামাজে মন বসে না, ঘুম আসে না, হঠাৎ করে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব আসে, জীবনে আসে এক অজানা ভারী ভাব।
অনেকে বলেন “স্ট্রেস” বা “ডিপ্রেশন” কিন্তু অন্তরের গভীরে আমরা জানি, সবকিছু কেবল মানসিক নয়; এর পেছনে থাকতে পারে আত্মিক এক সমস্যা, যা চিকিৎসা নয়, বরং কুরআনের আলোয় নিরাময় হয়।

এই আত্মিক চিকিৎসার নামই রুকাইয়াহ

রুকাইয়াহ (رُقْيَة) মানে হলো কুরআনের আয়াত ও সহীহ দোয়ার মাধ্যমে শরীর ও আত্মার নিরাময় চাওয়া।


“এবং আমি কুরআনে এমন জিনিস নাযিল করেছি, যা মুমিনদের জন্য শেফা (আরোগ্য) ও রহমত।”
(সূরা আল-ইসরা: আয়াত ৮২)

অর্থাৎ, রুকাইয়াহ হল আল্লাহর বাণীর মাধ্যমে নিরাময় – একেবারে বিশুদ্ধ, শিরকমুক্ত এক চিকিৎসা।

আগে রুকাইয়াহ কেবল সরাসরি করা যেত কিন্তু এখন প্রযুক্তির বরকতে ঘরে বসেই নেওয়া যায় অনলাইন রুকাইয়াহ সেশন, যেখানে আপনি দূর থেকে ভিডিও কল বা Zoom-এর মাধ্যমে রুকাইয়াহ সেবা পেতে পারেন, ঠিক যেমন আপনি সামনাসামনি উপস্থিত আছেন।

কিভাবে Zoom বা ভিডিও কলের মাধ্যমে হয়

অনলাইন রুকাইয়াহ মূলত Zoom, WhatsApp বা ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
রোগী প্রথমে নিজের সমস্যা সংক্ষেপে জানান যেমন – হঠাৎ করে কাজের প্রতি আগ্রহ হারানো, মন খারাপ, ভয় পাওয়া, বিয়ে না হওয়া বা সংসারে অকারণ অশান্তি ইত্যাদি।

এরপর রুকাইয়াহ হীলার ধৈর্য সহকারে রোগীর কথা শোনেন, তারপর শরীয়াহসম্মত উপায়ে কুরআনের নির্দিষ্ট আয়াত পাঠ করেন।
সেশনের পর রোগীকে দেওয়া হয় ব্যক্তিগত আমল, দোয়া ও করণীয় – যেন সে নিজেও নিয়মিত রুকাইয়াহ চালিয়ে যেতে পারে।

ভার্চুয়াল রুকাইয়াহ সেবা: দূরত্বে থেকেও নিরাময়

বর্তমান যুগে অনেকেই ব্যস্ততা, লজ্জা বা দূরত্বের কারণে সরাসরি রুকাইয়াহ নিতে পারেন না। অনলাইন রুকাইয়াহ তাদের জন্য এক সহজ, নিরাপদ ও শরীয়াহসম্মত সমাধান।

সব সেশন পরিচালিত হয় একদম গোপনীয়ভাবে, যাতে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য বা পরিস্থিতি কখনোই প্রকাশ না পায়।
রোগী তার মনের কথা  বিচারহীনভাবে, নিশ্চিন্তে বলতে পারেন।

সময়সূচী, ফি ও নির্দেশিকা

বাংলাদেশে হিজামা বা রুকইয়াহ সেশনের ফি সাধারণত সেবার ধরন ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণভাবে দেখা যায়– 

  • অফলাইন সেশন: প্রতি সেশন প্রায় ২০০০ টাকা থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
  • অনলাইন সেশন: সাধারণত ১০০০ টাকা হয়ে থাকে।
  • সময়: সেশন সাধারণত সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পরিচালিত হয়।
  • প্ল্যাটফর্ম: অনলাইন সেশনের জন্য সাধারণত Zoom বা WhatsApp ব্যবহার করা হয়।

নির্দেশিকা:
রুকইয়া সেশনের সময় ওযু করে, পরিস্কার পোশাকে, কিবলামুখী হয়ে, শান্ত পরিবেশে কানে হেডফোন দিয়ে বসা সুপারিশ করা হয়। মনোযোগ সহকারে কুরআনের আয়াত শোনা ও তা মেনে চলাই এখানে আসল আমল।

কেস স্টাডি 

কেস ১: দাম্পত্য জীবনের অস্থিরতা থেকে মুক্তি

একজন বোন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানালেন –
বিবাহের পর প্রথম বছর পরিপূর্ণ সুখের ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এক অদ্ভুত দূরত্ব চলে আসে। ছোটখাটো বিষয়েও ঝগড়া, রাগ, নীরবতা।
দুজনেরই নামাজে মন বসত না, ঘরে এক অচেনা ভারী ভাব।

বোনটি একদিন সাহস করে আমাদের অনলাইন রুকইয়া সেশনে অংশ নেন। প্রথম সেশনেই বোঝা গেল – এটি ছিল হাসাদ এর প্রভাব।

রুকইয়া হীলার কুরআনের নির্দিষ্ট আয়াত তেলাওয়াত করেন এবং তাঁকে প্রতিদিন সুরা আল-বাকারা পাঠের পরামর্শ দেন।

মাত্র ২১ দিনের মধ্যেই সেই বোন জানালেন – 

“আমাদের সংসারে যেন আল্লাহ আবার রহমত বর্ষণ করলেন। স্বামী এখন নামাজে নিয়মিত এবং ঘরে শান্তি ফিরেছে।”

এখন তারা একসাথে প্রতিদিন আল-কুরআনের তেলাওয়াত করেন

কেস ২: সফল ব্যবসায়ী ভাইয়ের মানসিক মুক্তি

একজন ভাই (নাম গোপন রাখা হলো) ভালো ব্যবসায়ী ছিলেন। অর্থ, সম্মান সব ছিল। কিন্তু একসময় তার মধ্যে অদ্ভুত অস্থিরতা শুরু হয়। ব্যবসায় লোকসান, সিদ্ধান্ত নিতে ভয়, নামাজে মন বসত না। রাতে ঘুম হতো না।

তিনি অনলাইন রুকাইয়াহ সেশনে যোগ দেন। প্রথম সেশনেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি, কুরআনের আয়াত শুনে বুক হালকা হয়ে যায়।
রুকইয়া হীলার তাঁকে বলেন, এটি এক ধরনের জিনের প্রভাব।

নির্দিষ্ট আয়াত পাঠ, দোয়া, এবং রুকাইয়াহ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত চিকিৎসা চালান।
দুই সপ্তাহের মাথায় তিনি জানালেন –

“যে ভারে আমি দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম, আল্লাহর কুরআন সেই ভার সরিয়ে দিল। এখন মন প্রশান্ত, ব্যবসায়ও বরকত ফিরেছে।”

কেস ৩: সন্তান না হওয়ার মানসিক কষ্ট

আরেকজন বোন, বিবাহের পাঁচ বছর পরও সন্তান না হওয়ার কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। ডাক্তারি রিপোর্টে সব কিছু ঠিক, তবুও অকারণ বিষণ্ণতা, আত্মবিশ্বাস হারানো।

তিনি অনলাইন রুকাইয়াহ নেন। এক মাস পর তিনি মেসেজ করে জানালেন, আলহামদুলিল্লাহ, তিনি গর্ভবতী।

“আমি জানি, আল্লাহই চিকিৎসক। রুকাইয়াহ শুধু আমার মনে আল্লাহর কাছে ফেরার দরজা খুলে দিয়েছে।”

এই গল্পগুলো কেবল সাফল্যের নয়, এগুলো আত্মার জাগরণের গল্প।
রুকাইয়াহ চিকিৎসা নয়, বরং এক আমল যেখানে রোগী নিজেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তাঁর কিতাবের আলোয় নিজের জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়।

FAQ: অনলাইন রুকইয়াহ সম্পর্কে

প্রশ্ন ১: রুকইয়া কি জাদুবিদ্যার মতো কিছু?

উত্তর: না, কখনোই না। রুকইয়া হচ্ছে সহীহ ইসলামী চিকিৎসা, যা শিরকমুক্ত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“যে রুকইয়া, তাবিজ বা জাদুবিদ্যা করে, সে শিরকে লিপ্ত হয়।”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২০০)

প্রশ্ন ২: অনলাইন সেশনে কীভাবে প্রস্তুত হব?
উত্তর: ওযু করে, পরিষ্কার পরিবেশে বসে, কিবলামুখী হয়ে, মনোযোগী অবস্থায় হেডফোন কানে দিয়ে সেশন নেওয়াই উত্তম।

প্রশ্ন ৩: অনলাইন সেশন কি গোপন থাকে?
উত্তর: প্রত্যেকটি সেশন ১০০% প্রাইভেট ও নিরাপদ পরিবেশে হয়। রোগীর তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হয় না।

প্রশ্ন ৪: একবার রুকইয়া নিলেই কি নিরাময় হয়?
উত্তর: কখনো কখনো হ্যাঁ, আবার কখনো ধৈর্য ও নিয়মিত আমলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ফল আসে। নিরাময় আল্লাহর হাতে, আমরা কেবল তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।

শেষকথা, অনলাইন রুকইয়া আজ শুধু এক সেবা নয়, বরং এক আশ্রয় যেখানে দুঃখী মন, ভাঙা আত্মা এবং হারানো শান্তি ফিরে পায় নতুন অর্থ।
কুরআনের আয়াতের আলোয় নিরাময় শুধু রোগ সারায় না, বরং অন্তরকেও পুনর্জীবিত করে।যদি মনে ক্লান্তি, জীবনে ভার, বা অজানা এক অস্থিরতা অনুভব করেন তাহলে ভয় নয়, কুরআনের দিকে ফিরুন।
সেখানেই আছে শান্তি, সেখানেই আছে আরোগ্য।

রাসূল (সাঃ)- এর নির্দিশিত চিকিৎসা পদ্ধিতির আলোকে জিন, জাদু, বদনজর, হাসাদ জনিত সমস্যা এবং সকল প্রকার শারীরিক – মানষিক রোগের চিকিৎসা করা হয়।