হিজামা প্রতিক্রিয়া: সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা

হিজামা প্রতিক্রিয়া। হিজামা একটি সুন্নাহভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যা শরীর ও আত্মার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। তবে যেহেতু এটি শরীরের ভেতরের দূষিত রক্ত বের করে দেয়, তাই হিজামার পর শরীরের কিছু প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। এগুলো সাধারণত সাময়িক এবং শরীরের শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ারই অংশ।

সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

হিজামার পর শরীরের ভেতরে একটি পরিবর্তনের ধারা শুরু হয় যা শরীরকে সুস্থতার দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনের সময় কিছু হালকা প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বরং শরীরের ভেতরে চলা এক প্রাকৃতিক নিরাময় প্রক্রিয়ারই চিহ্ন।

১. ক্লান্তি বা অবসাদ:
হিজামার পর অনেকে বলে থাকেন – “মনে হচ্ছে শরীরটা একটু ভারী লাগছে, ঘুম পাচ্ছে।” এটি আসলে শরীরের ভেতরকার ডিটক্স প্রক্রিয়ার ফল। যখন শরীর পুরনো রক্ত ও টক্সিন বের করে দেয়, তখন সামান্য ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। এ সময় পর্যাপ্ত পানি পান করুন, বিশ্রাম নিন এবং ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন।

২. ত্বকে লালচে দাগ বা র‍্যাশ:
কাপ লাগানো স্থানে লাল দাগ বা হালকা ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সাধারণত ৩-৪ দিনের মধ্যে এগুলো নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়। জায়গাটি পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন, গরম পানি বা সূর্যের আলো এড়িয়ে চলুন, প্রয়োজনে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করতে পারেন।

৩. হালকা ব্যথা বা টান অনুভব:
কাপের টানজনিত কারণে অনেক সময় চামড়ায় বা পেশিতে অল্প ব্যথা থাকে। সাধারণত এক-দুই দিনের মধ্যেই তা কমে যায়। চাইলে উষ্ণ পানির হালকা সেঁক দিতে পারেন।

৪. মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা:
কখনও কখনও, বিশেষ করে যারা নিম্ন রক্তচাপে ভোগেন, তারা হিজামার পর মাথা ঘোরা বা হালকা দুর্বলতা অনুভব করতে পারেন। এ সময় একটু পানি বা মিষ্টি কিছু খেয়ে বিশ্রাম নিন। এই প্রতিক্রিয়াগুলো সাময়িক, তবে দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৫. সামান্য ফোলাভাব বা চুলকানি:
কাপিং করা জায়গায় হালকা ফোলাভাব দেখা দিতে পারে, যা সাধারণত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কমে যায়। জায়গাটি চুলকাবেন না; বরং পরিষ্কার রাখুন এবং প্রয়োজন হলে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।

কখন চিকিৎসা নিতে হবে?

সাধারণত হিজামার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো ক্ষণস্থায়ী এবং ক্ষতিকর নয়। কিন্তু কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

যদি কাপিং করা স্থানে অস্বাভাবিক ব্যথা, ফোলাভাব, রক্তপাত বা পুঁজ দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে হিজামা থেরাপিস্ট বা ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
এছাড়াও, যদি হিজামার পর শরীরে জ্বর আসে, ঠান্ডা লাগে, মাথা ঘোরে বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয় তখন অবশ্যই পেশাদার চিকিৎসা নিতে হবে।

এটা মনে রাখা জরুরি যে, শরীরের প্রতিক্রিয়া সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না। কারো শরীর দ্রুত রিকভার করে, আবার কারো কিছুটা সময় লাগে। 

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা

হিজামা করার আগে এবং পরে কিছু ছোটখাটো নিয়ম মেনে চললে অনেক বেশি উপকার হয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রায় থাকে না বললেই চলে।

হিজামার আগে:

  • সম্পূর্ণ খালি পেটে করবেন না; হালকা কিছু খেয়ে নিন।

  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

  • মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকুন; ভয় বা উৎকণ্ঠা যেন না থাকে।

  • যদি রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো অসুস্থতা থাকে, আগে থেকেই থেরাপিস্টকে জানান।

হিজামার পরে:

  • হিজামার পর অন্তত ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত গোসল, সাঁতার বা গরম পানির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন।
  • তেল-মশলাযুক্ত খাবার ও ঠাণ্ডা পানীয় পরিহার করুন।

  • শরীরকে বিশ্রাম দিন এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।

  • জায়গাটি পরিষ্কার রাখুন এবং দিনে অন্তত একবার হালকা অ্যান্টিসেপ্টিক লাগান।

শেষ কথা

হিজামা একটি প্রাকৃতিক ও ইসলামসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি, যা শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি এনে দিতে পারে। কিন্তু এর সঠিক ফল পেতে হলে অবশ্যই প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ হিজামা বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে এটি করা উচিত।

হযরত আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জিবরীল আমাকে জানিয়েছেন যে, মানুষ চিকিৎসার জন্য যতসব উপায় অবলম্বন করে, তম্মধ্যে হিজামাই হল সর্বোত্তম।” (আল-হাকিম, হাদিস নম্বর: ৭৪৭০)

সুতরাং হিজামা শুধু একটি চিকিৎসা নয় বরং এটি সুন্নাহর অংশও। তাই সচেতনভাবে, সঠিক নিয়মে এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে হিজামা করলে এর সুফল পাওয়া যায় অনেক বেশি আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোও নিয়ন্ত্রণে থাকে।

রাসূল (সাঃ)- এর নির্দিশিত চিকিৎসা পদ্ধিতির আলোকে জিন, জাদু, বদনজর, হাসাদ জনিত সমস্যা এবং সকল প্রকার শারীরিক – মানষিক রোগের চিকিৎসা করা হয়।